আসতে হবে এক ছাতার নিচে : ব্যরিস্টার আবু সায়েম

293

 

মাশাল্লাহ! জেগে উঠেছেন চেতনাবাজরা। লুন্ঠিত ভোটে ডাকসুর ভিপি ‘নির্বাচিত’ হওয়া নুরুল হক নুর ধর্ষণের বিচারপ্রার্থী মেয়েটিকে দুশ্চরিত্রা বলায় বেজায় ক্ষেপেছেন আমাদের মা-মাসী ও তাদের পুংচ্যালারা। সর্বশেষ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নুরের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তার সংগঠনেও হাত দিয়েছে শাসকগোষ্ঠী।

একজন অভিযোগকারিণীকে দুশ্চরিত্রা (যদিও নুরের মুখ থেকে বেরিয়েছে ‘দুশ্চরিত্রাহীনা’; বাংলা ভাষায় নতুন শব্দ হিসেবে যোগ করলে এর অর্থ দাঁড়াবে ‘চরিত্রবতী’) আখ্যায়িত করা সমীচীন কিনা আজ সে বিতর্কে যাবো না, কারণ তাতে মূল আলোচনা ঢাকা পড়ে যেতে পারে। এমনটা প্রায়শই ঘটে, গোড়া বাদ দিয়ে আমরা শাখা-প্রশাখা নিয়ে মেতে উঠি। আজ গোড়াতেই থাকবো এবং বুঝতে চেষ্টা করবো, নারীর কিংবা বৃহত্তর অর্থে জনগণের অধিকার আদায়ে আমাদের চেতনাবাজদের ভূমিকা ও অবদান কী-কতটুকু। মাঝে মাঝে তাদের জ্বলে ওঠার কারণও খতিয়ে দেখার প্রয়াস থাকবে।

নুরকে নিয়ে টিভিতে কথা বলছে একদল, মাঠে নেমেছে আরেক দল। তারা নুরের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করে তাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে। মূল অভিযোগ ধর্ষণের। পরের অভিযোগ, নুর ‘ধর্ষিতা’কে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছে। নুরের বিরুদ্ধে ফাতেমা বিথীর করা ধর্ষণ মামলাটিই মূলত কেলেঙ্কারির উৎস। কিন্তু বিথীর অভিযোগে নুর ধর্ষণ করেছে—এরকম কিছু বলা হয়নি। বলা হয়েছে, সে ধর্ষণের বিচারে সহযোগিতা না করে বরং ‘ভিক্টিম’কে হুমকি দিয়েছে। সেক্ষেত্রে ধর্ষণের মামলায় নুরকে জড়ানো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে হচ্ছে। সম্প্রতি ইত্তেফাকে ‘বিবাহপ্রতিশ্রুতি ধর্ষণ ও আইন’ শিরোনামে প্রকাশিত আমার একটি কলামে (http://epaper.ittefaq.com.bd/?date=2020-10-03&page=10&news=10_100&print=yes) আমি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে দেখিয়েছিলাম বিয়ের প্রতিশ্রুতি থেকে সংঘটিত সহবাসকে কেন ধর্ষণ বলা যাবে না। সেমতে মেয়েটির সাথে যা ঘটেছে তা ধর্ষণ নয়। হতে পারে প্রতারণা, তবে নারী-পুরুষের মানবিক মেলামেশার অবধারিত পরিণতিকে উপলক্ষ করে আনা প্রতারণার অভিযোগ হালে পানি পেতে পারে কিনা সে নিয়ে ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছে আছে। কিন্তু তাতেও নুরকে জড়ানোর সুযোগ নেই বলেই আমার বিশ্বাস। সামাজিক কিংবা ধর্মীয় চুক্তির আওতায় আইনের খাতায় কাউকে দোষী হিসেবে নাম লেখানোর এ উদ্যোগ ভালো দৃষ্টান্ত হতে পারে না। কথাতে কথা বাড়ে, এক কথা থেকে অন্য কথায় গড়ায়। সামাজিক ও ধর্মীয় চুক্তি আমাদের হাতে কতটুকু হাতকড়া পরাতে পারে সে নিয়েও বিস্তর মত প্রকাশের সুযোগ আছে। যা-ই হোক, আজ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব, ব্যক্তিগত অথবা প্রাতিষ্ঠানিক যে অর্থেই বলুন, নুরের নয় ধরে নিয়েই এগোতে চাই।

ভাবনার বিষয় হচ্ছে, আইন প্রয়োগের জন্য রাষ্ট্রের আইনপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে না গিয়ে অভিযোগকারিণী যখন নুরের মতো একজনের কাছে ধরনা দেয়, তখন এ রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে। দেশে ধর্ষণের মওসুম লেগেছে। তিন বছরের শিশু থেকে শুরু করে শতবর্ষী বৃদ্ধা পর্যন্ত কেউ সরকারি দলের গুন্ডাদের লালসার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। প্রতিকারতো দূরের কথা, রাষ্ট্র বরং অপরাধীদের সুরক্ষা দিচ্ছে। কই, আমাদের মা-খালা বা তাদের পুংসহযোদ্ধারাতো রাষ্ট্রকে নিয়ে মুখ খুলছেন না? কারণ কি এই যে, গায়ের জোরে যারা রাষ্ট্র চালাচ্ছে তারা তাদের পছন্দের লোক? তো ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত পছন্দ-অপছন্দ যখন আপনার ন্যায়বিচারের মানসিক ব্যারোমিটার নিয়ন্ত্রণ করবে, তখন আপনি আর নিরপেক্ষ নন। আপনি প্রকাশ্যে যা বলেছেন, বলছেন ও বলবেন, তার পেছনে আবশ্যই অন্য উদ্দেশ্য আছে—কায়েমি স্বার্থের বাস্তবায়ন। আপনি সুবিধাবাদের দোষে দুষ্ট। সমাজের সকল ইস্যুতেই আপনার নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা কাম্য থাকলেও আপনি একচোখা নীতি অবলম্বন করে চলেছেন। হ্যাঁ, দলীয় রাজনীতিতে যারা যুক্ত, তারা অনেক সময় চাইলেও দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন না, সেটা সারা পৃথিবীতেই। কিন্তু কথিত চেতনাবাজরা কেউ রাজনীতিবিদ না। জনসমক্ষে তারা নিজেদের রাজনীতির ঊর্ধ্বে, মানবতাবাদী বলেই প্রচার করেন। সেক্ষেত্রে লুটেরা রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রাখতে মরিয়া কেন তারা? অবৈধ সরকার এবং সরকারের প্রধানকে নিয়ে আজ পর্যন্ত টু শব্দটি করতে শুনেছেন এদের কাউকে? এমন মা-মাসী ও তাদের পুংসহযাত্রীরা ন্যায়বিচারের পক্ষের মানুষ, এ কথা পাগলেও মেনে নিবে না।

চেতনাবাজরা তাহলে হঠাৎ হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে ওঠেন কেন? কারণ আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক এক নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণে তৎপর এ মানুষগুলো। তাদের সে স্বপ্ন ও অভিলাষ পূরণের পথে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ও তাদের উচ্ছিষ্টভোগী কিছু ব্যক্তি-দল-মিডিয়া-প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকি আমরা সবাই অন্তরায়। মধ্যরাতে নির্বাচন সেরে গদিতে বসে আছে ক্রীতদাস সরকার। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে দেশের বাইরে। তাতে নারীবাদীদের কিছু যায় আসে? দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা হাজারে হাজারে খুন হয়, গুম হয়; গেস্টাপো বাহিনী নির্যাতন করে তাদের পঙ্গু বানিয়ে দেয়—মাইন্ড করেন না এসব মা-খালা ও তাদের পুংদোসররা। এমনকি সরকারি দলের রেইপিস্টরা যখন কোন অসহায় মেয়েকে ধর্ষণ করে কিংবা পাশবিক নির্যাতন শেষে হত্যা করে—সেসবে আগ্রহ দেখান না চেতনাবাজরা। আচ্ছা, সুবর্ণচরের পারুল অথবা সিলেটের গৃহবধুটির জন্য চেতনাবাজদের ভূমিকা কী? কতটুকু ঝড় তুলেছেন তারা সরকারের বিরুদ্ধে? অথচ আর কারো পান থেকে চুন খসলেই এ অভিভাবকের দল হৈ হৈ করে তেড়ে আসেন। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের কথা মনে আছে? অদ্ভুত এক ‘মানবী’কে চরিত্রহীন বলতে চাওয়ার কারণে তাকে সোজা গারদে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। দুই দফায় তিন মাসেরও অধিক কারাগারে কাটিয়ে মোটামুটি বোবাটকি বনে গেছেন ব্যারিস্টার হোসেন। এবার ফেঁসেছে নুরুল হক নুর। অথচ কলঙ্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্রদলের জনপ্রিয় ছেলেমেয়েদের বঞ্চিত করে নুরকে যখন ডাকসুর ভিপি বানানো হয়, তখন জাতীয় চেতনাবাজরা তাকে স্বাগত জানিয়েছিলো। কারণ অবৈধ সরকারের ইমেজ রক্ষায় তা না করে উপায় ছিলো না। লক্ষ্য একটাই, যে কোন মূল্যে শেখ হাসিনার গদি বাঁচাতে হবে। এখন নুর তাদের বিরুদ্ধে কথা বলছে; অতএব সে খারাপ! তাকে চ্যাংদোলা করতে হবে। রেহাই নেই। সেটা কীভাবে?

কৌশলটা খুব সুক্ষ্ম। নুর কিংবা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন—দুইজনের একজনও সেটা ধরতে পারেননি। পারেন না হয়তো অন্যরাও। উঠতে বসতে কটাক্ষ করে, মিথ্যা রটনা রটিয়ে, কোন না কোন দুয়ো দিয়ে কিংবা প্যাঁচে ফেলে প্রতিপক্ষকে, বিশেষ করে দেশপ্রেমিক মানুষগুলোকে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়, যেন তারা মুখ ফসকে বেফাঁস কিছু বলে বা করে ফেলে। তারপর তাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয় উগ্র নারীবাদী বা সরকারি পোষা বাহিনীগুলোকে। তারা মিডিয়ায় এসে বিষোদগার করে; প্রেসক্লাব, রাজু ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে টার্গেটকে গ্রেপ্তারের দাবি জানায়। যথারীতি আইনি প্রক্রিয়ায় টার্গেটের হাতে দড়ি পরানো হয় এবং একসময় সরকার তাকে বাক্সবন্দি করে ফেলে। এভাবেই খেল খতম হয়ে যায় এক একজন দেশপ্রেমিকের। নূর দেশপ্রেমিক, নাকি সরকারের খেলার পুতুল—এ নিয়ে বিতর্ক আছে। সেটা স্পর্শকাতর বিষয়, সময়ই উত্তর দিবে। তবে খোলা চোখে দেখছি, নুরকে খতম করতে উঠে পড়ে লেগেছে চেতনাবাজরা। পারবেন ঠেকাতে?

হয়তো সম্ভব। কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সব ভুলে দেশপ্রেমিকদের এক ছাতার তলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আগ্রাসন ও দাসত্ববাদের বিরুদ্ধে চলমান কঠিনতম লড়াইয়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের পতাকা যাদের হাতে, তাদের নেতৃত্ব মেনেই আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আপনার সমীকরণ যা-ই হোক, আপনি যতবড় ডাক্তার-ব্যারিস্টার-ডক্টর-ছাত্রনেতাই হোন, আপনাকে ফিরতে হবে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কাণ্ডারীদের কাছেই। নয়তো মুক্তি মিলবে না। একে একে দেশপ্রেমিকদের অন্তর্ধান ঘটবে।