বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট এবং আজকের বাংলাদেশ : মিনার রশিদ

62

এক গ্রামে একজন সর্বজনমান্য জ্ঞানী লোক ছিলেন। সবাই তার কাছে আসে দোয়া ও পরামর্শ নিতে । কোনো মামলার বাদী দোয়া নিতে আসলে বলেন, তুমি ঠিক। বিবাদী আসলেও বলেন, তোমার দাবি যথার্থ। এটা নিয়ে কেউ যদি প্রশ্ন করেন, একই মামলায় বাদী ও বিবাদী উভয়েই ঠিক হয় কিভাবে ? তখন মুচকি হাসি দিয়ে বলেন, তোমার এই কথাটাও ঠিক।

জাতীয় শোকদিবস উপলক্ষ্যে দৈনিক প্রথম আলোতে আসিফ নজরুলের একটি কলাম দেখে উপরের গল্পটি মনে পড়ে গেল । কলামটির শিরোনাম ছিল – বঙ্গবন্ধুকে কেন ভালোবাসি? বঙ্গবন্ধুর প্রতি এই ভালোবাসায় কোনো পাপ বা সমস্যা নাই। খটকা লেগেছে বাকশালের প্রতি উনার অনুরাগ দেখে। বাক স্বাধীনতার জন্যে সোচ্চার একজন ইন্টেলেকচুয়ালের পক্ষে এই বাকশালের পক্ষে সাফাই গাওয়াতে অনেকেই হতবাক হয়েছেন।

এই আকড়ার বাজারে দেশের মধ্যে অবস্থান করে যে কয়জন একটু সাহসী ও সত্য কথা বলেন তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম । কিন্তু তাঁর এই কলামটি একটি ভুল ম্যাসেজ ছড়িয়ে দিতে পারে । তাই নিতান্ত নিরুপায় হয়ে দুয়েকটি কথা না লিখে পারলাম না । আসিফ নজরুল যে পত্রিকাটিতে আর্টিকেলটি লিখেছেন সেই পত্রিকাটির আদর্শ ও পলিসিই প্রতিফলিত হয়েছে তার এই লেখাটিতে । সারা বছর মোটামুটি সত্য বলে পাঠক ধরে রাখেন , লাইকের সংখ্যা নিশ্চিত করেন। আবার একদিন সরকারের পক্ষে এমন একটি কথা বলেন যা সারা বছরের কাফফারা হয়ে যায়। পত্রিকাটি জানে কখন কাকে কিভাবে খুশী রাখতে হয়, আবার কিভাবে পাঠককেও ধরে রাখতে হয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নামে ঝোপ বুঝে কোপ মারার এই সাংবাদিকতা দেশ ও জাতিকে বর্তমান খাদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

অষ্ট্রেলিয়া থেকে জনৈক ছোট ভাই অনুরোধ করেছেন প্রফেসর জাফর ইকবাল যে আসলে একটি দলের হয়েই কাজ করছেন এরকম কিছু প্রমাণ পেলে যেন ওকে পাঠিয়ে দেই । কারণ ওর কিছু কলিগ ও বন্ধুদেরকে এই প্রমাণ দেয়া জরুরত হয়ে পড়েছে ।

ছোটভাইকে কীভাবে বুঝাই যে এগুলি এমন এক জিনিস যা শুধু বোঝা যায় কিন্তু ধরা যায় না ! কিছুদিন আগে প্রফেসর জাফর ইকবালকে প্রধান অতিথি করে সিঙ্গাপুরস্থ বিএলএসএসের উদ্যোগে একটি অনলাইন আলোচনার আয়োজন করা হয় । আলোচনার পরিবেশটিও ছিল অত্যন্ত চমৎকার । অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে জনাব জাফর ইকবাল শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ব্যক্ত করেন । অনুষ্ঠানটি দেখে মনে হচ্ছিল সাদা দিলের এই প্রফেসর রাজনীতির ‘র’ ও বুঝেন না । প্রফেসর জাফর ইকবালগণ খাঁচার মত বড় ভাগ্য নিয়ে জন্মেছেন । যখন উনাদের রাজনীতি করার দরকার পড়ে , তখন স্বাধীনতার চেতনাকে টেনে নিয়ে আসেন I আওয়ামী দলকানা শিক্ষক দিয়ে বিএনপি দলকানা শিক্ষকদের কাটাকাটি করা হয়।

অত্যন্ত ঈমানদারীর সাথে এই কাটাকাটি করার পরে নিরপেক্ষ ইমেইজের স্বাধীনতার পক্ষের এই জাফর ইকবালরা আওয়ামী লীগের জন্য বোনাস হিসাবে মজুদ থেকে যান । এই কিছিমের বোনাস প্রতিপক্ষ বিএনপির কপালে ঘুণাক্ষরেও জোটে না।

কিন্তু তারই ভাতিজি জামাই আসিফ নজরুলকে ইতোমধ্যে বিএনপি – জামায়াতের ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে । কপাল আজ এতই মন্দ যে এই আসিফ নজরুলই বিএনপি – জামায়াতের ভাবনার জগতে উথাল পাতাল সৃষ্টি করে বসেছেন । দুদিন আগে একটি অনলাইন টক শোতে বলেছেন ,” শেখ হাসিনা ভারত বিরোধী রাজনীতি শুরু করতে যাচ্ছে এবং আমি বলে রাখলাম , এইটা ভীষণ জনপ্রিয়তা পাবে ।” কাজে কাজেই ২০২৪ এর সাধারণ নির্বাচনে বর্তমান সরকার আবারো বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতে গেলে এই সরকারের তো বদনাম করা সম্ভব হবে না ।
এটা অস্বীকারের উপায় নেই যে এই কঠিন সময়ে দেশের মধ্যে অবস্থান করে যে দুয়েকজন একটু আধটু সত্য কথা বলছেন বা লিখছেন তাদের মধ্যে আসিফ নজরুল অন্যতম । এখন তিনি যদি তার সত্য কথাগুলি বলার সুযোগের বিনিময়ে সর্বশেষ এই ছাড়টি দিয়ে থাকেন তবে মনে হয় এটি একটি অতি এক্সপেন্সিভ ছাড় । অর্থাৎ একটি সত্য হজম করা হবে যদি আপনি সাথে একটি মিথ্যা প্রশংসা যোগ করেন।

আসিফ নজরুল বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসতে পারবেন না এমন কোনো কথা নেই । গোলমেলে ঠেকেছে একজনকে ভালোবাসতে হলে তার সকল কাজকর্মকে ভালোবাসতে হবে , কোনো একটি ব্যাপারেও সমালোচনা করা যাবে না – এই প্রবণতাটি । তাছাড়া লেখক এতকাল যা লিখেছেন , আজকের একটি মন্তব্য তাঁর সবগুলি লেখার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে ।

বাকশাল যদি খারাপই না হয় তবে এই সরকারের সকল কর্মকান্ড মেনে নিতে অসুবিধা কোথায় ? বর্তমান সরকার কর্তৃক নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করার জন্যে একজন কট্টর সমালোচক আসিফ নজরুল । কিন্তু একদলীয় বাকশাল কায়েম করতে হলে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না । গুম , খুন করে বিরোধীদলের নেতা কর্মীদের টেরোরাইজ করতে না পারলে , সকলের মনে ভয়ের সঞ্চার করতে না পারলে এরা রাস্তায় বেরিয়ে পড়বে । জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে পড়লে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা কখনোই সম্ভব হবে না । কাজেই এই সরকার যা করেছে কৌশল হিসাবে সব ঠিক আছে।

কাজেই শেখ মুজিবের আদর্শের বাকশাল কায়েমের লক্ষ্যে এটুকু করে সরকার তো কোনো অন্যায় করছে না । বাকশালকে একটি মহৎ কর্ম আখ্যায়িত করে আপনি কেন সেটি বাস্তবায়নের পন্থার বিরোধিতা করে আসছেন ? একদলীয় শাসন কায়েম করতে এর অন্য কোনো বিকল্প আদৌ রয়েছে কি ? বরং বলতে পারেন যে শেখ মুজিব তার সেই আদর্শকে বাস্তবায়নের সুযোগ পান নাই কিংবা তা সঠিকভাবে করতে পারেন নাই । বর্তমান সরকার কিংবা তার মেয়ে তা করতে পেরেছেন।

১৯৭৫ এর পর প্রায় ৪০ বছর আওয়ামী লীগ এবং তাদের বুদ্ধিজীবীরা বাকশাল শব্দটি নিয়ে নীরবতা পালন করেছে । ২০০৯ সাল থেকে সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করলেও এটাকে মুখে উচ্চারণ করার নৈতিক বল ছিল না । যদিও দৈনিক আমার দেশের মজলুম সম্পাদক সেই ২০০৯ সালেই এই বাকশালের পদধ্বনির কথাটি তার একটি লেখায় জানিয়েছিলেন। সবকিছু ম্যানেজ করার পর এখন আস্তে আস্তে তা উচ্চারণ করা শুরু করেছে । এমতাবস্থায় সরকারের কট্টর একজন সমালোচকের কলম বা মুখ থেকে সেই বাকশালের গুণকীর্তন এই ফ্যাসিবাদি সরকারের জন্যে বিরাট পাওনা।

সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে , পচন ধরেছে আমাদের মগজে । এই সুযোগে শত্রুরা আমাদের সমাজকে ডিপলিটিসাইজড করে ফেলেছে । এখন শুধু তার ফসলটি ঘরে তুলছে । একদিকে সংস্কৃতি ও বিনোদনের নামে অশ্লীলতা , বেহায়াপনা ও পর্নোগ্রাফি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দিয়েছে । অন্যদিকে হোরোইন , ফেন্সিডিল ও ইয়াবা দিয়ে যুব সমাজকে বুঁদ বানিয়ে রেখেছে । এসব থেকে যারা মুক্ত আছে সেই বাদবাকিকে নেশাগ্রস্ত করা হয়েছে ক্রিকেট উন্মাদনা দিয়ে । ক্রিকেট নামক সেই আফিম খেয়ে আমরা ২৫শে ফেব্রুয়ারীর পিলখানার বেদনা ভুলে যাই । ভুলে যাই গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন হারানোর বেদনাও। খেলোয়াড় এবং বিনোদন জগতের চাঁদমুখরা জাতির আইডল এবং বিবেক বনে গেছে !

কাজেই সারা শরীরে ময়লা রেখে ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক দেখেই বলি দারুন উন্নয়ন ! বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উত্সবে প্রেসিডেন্টের গ্রাম্য ভাড়ামো মার্কা কথা শুনে বিগলিত হয়ে পড়ি এবং তা দেখে ও শুনে হাসতে হাসতে আমাদের পেটে খিল ধরে যায় ! আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক হাইট মারাত্মকভাবে কমে গিয়েছে ! ক্লাস টুয়ের ছাত্রের সমপরিমাণ জিও-পলিটিকেল জ্ঞান নেই এমন ব্যক্তিরা হয়ে পড়ে জাতির নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ! অযোগ্যতাই আজ সবচেয়ে বড় যোগ্যতা । দালাল , চাটুকার হওয়ার জন্যে এই মেধাহীনরাই যথাযথ।

বহু ঢাকঢোল পিটিয়ে এতদিন যাদেরকে জাতির বিবেক হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে সেই শ্রেণীটি পুরো শীত নিদ্রায় চলে গেছেন । দেশে ও সমাজে যত অবিচার , দু:শাসন , দুর্নীতি চলুক না কেন – এসব তাদের এখন আর স্পর্শ করে না। ভীরুতা , সুবিধাবাদিতা এবং সকল কিছু থেকে গা বাঁচিয়ে চলার একটা ভয়ংকর প্রবণতা খেয়াল করা যায় । এই সুযোগে ফ্যাসিবাদ নামক এক দানব আমাদের সকল সত্ত্বাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে চলছে।