মোহাম্মদ বিন সালমান কি আসলেই ইহুদিবাদী?

29

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান “ক্রাউন প্রিন্স” হওয়ার পর থেকে তার তথাকথিত লিবারেল ইসলাম, অর্থনৈতিক সংস্কার, সাংবাদিক জামাল খাশোগজি হত্যা সহ একাধিক ইস্যুতে তাকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনা কম হয়নি। তবে তার যে বিষয়টি সবচাইতে বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তা হল, মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) কি আসলেই ইহুদিবাদী?

এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানতে হলে, “ক্রাউন প্রিন্স” হওয়ার পর থেকে, ফিলিস্তিনি ও দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইজরাইলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানা জরুরী।

তবে বলে রাখা ভাল।
ইহুদিবাদী হওয়ার জন্য জন্মগত ইহুদি কিংবা ইহুদি ধর্মের অনুসারী হওয়ার দরকার পড়ে না। এই টার্ম ইহুদি ধর্মের অনুসারী হওয়া বুঝায় না। বরং, পৃথিবীতে হাজারো ইহুদি ধর্মের নয় এমন “ইহুদিবাদী লোক” রয়েছে যারা দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদিবাদী ইজরাইলি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করছে।

সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ইতোমধ্যেই দখলদার ইহুদীবাদী রাষ্ট্রের সাথে শান্তি চুক্তি না করার জন্য ফিলিস্তিনিদের অভিযুক্ত করে বলছে। ইজরাইলিদেরও শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করার অধিকার আছে। গত কয়েক দশক ধরে, দখলদার ইহুদিবাদী এই দেশটি যখন ক্রমাগত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করছে, হাজার হাজার নিরীহ মানুষ হত্যা করছে, লাখ লাখ শরনার্থী বানাচ্ছে, বহিঃবিশ্ব থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে চরম অমানবিক দমন-পীড়ন চালাচ্ছে, ঠিক তখনই এমবিএস ইজরাইলিদেরও শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের অধিকারের কথা বলছে। তাই, ক্রাউন প্রিন্সের এধরণের বক্তব্যে নিঃসন্দেহে দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থকদের ভাষ্যকেই প্রতিধ্বনিত করছে।

গত জানুয়ারি শেষ দিকে, নাৎসিদের হাতে ইহুদি গণহত্যার ৭৫তম বার্ষিকী পূর্ণ হওয়ার স্মরণে, সৌদির একজন প্রসিদ্ধ শেখ পোল্যান্ডের আউসুইজ কনসেনট্রেশান ক্যাম্প সফর করছিল। এই ক্যাম্প সেন্টারের প্রেস অফিসের তথ্য মতে, মুহাম্মাদ আল ঈসা নামের এই ব্যাক্তি হলেন সবচাইতে সিনিয়র মুসলিম ধর্মীয় নেতা। যিনি ইহুদি গণহত্যার স্বরণে তৈরি এই মেমোরিয়াল সাইট সফর করছে। ধারণা করা হয় এই কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে ১০ লাখের মত ইহুদি হত্যা করা হয়েছিলো। অথচ, ইজরাইল নিজেই এই হলোকাস্টকে ফিলিস্তিনি জমি জবরদখল, দমন-পীড়ন ও আন্তজার্তিক ভূ-রাজনীতিতে সমর্থন পাওয়ার হাতিয়ার রুপে ব্যবহার করে। তাই মূলত এমবিএস ঘনিষ্ঠ আল ঈসাকে এই ক্যাম্পে পাঠিয়ে মোহাম্মদ বিন সালমান ইজরাইলের প্রতি তার সমর্থন ব্যক্ত চেয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন তার দেশের দূতাবাস, তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে নিয়ে আসলেন আর ব্রাজিলও একই সিদ্ধান্ত নিল, তখন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের সাথে যোগাযোগ করে, দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর না করার অনুরোধ জানান। কিন্তু দেশটির প্রেসিডেন্টের জবাবে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ছিলো। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট “জেইর বলসোনারো” উত্তরে জানিয়েছিলো, সৌদিরাইতো ব্রাজিলকে তাদের দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নিতে চাপ দিচ্ছিলো।
সৌদির মোহাম্মদ বিন সালমানকে ইহুদিবাদী বলার জন্য এর চাইতে বড় প্রমাণ আর কি বা হতে পারে?

শুধু কি তাই? হামাসের প্রতিনিধি সহ সৌদি আরব নহু ফিলিস্তিনি নাগরিককে গ্রেপ্তার করে, কারাগারে নিক্ষেপ করছে, যারা নিয়মিত অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় আর্থিক সহায়তা পাঠাতেন। সৌদি সরকারের এধরণের নীতি নিশ্চিতভাবে ইজরাইলি স্বার্থকেই রক্ষা করছে। ফিলিস্তিনিদের আরো কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে, ইজরাইলের অপরাধযজ্ঞে উৎসাহিত করছে।

Moment Magazine এর এক সাংবাদিকদের ভাষ্য, এমবিএসের বাবা সালমান বিন আবদুল আজিজ, পূর্ব জেরুজালেমেকে রাজধানী করে। স্বাধীন ফিলিস্তিনের যে কথা সর্বদা বলে বেড়ান তা নিছক counterweight বা দুপক্ষের ভারসাম্য রক্ষা করার কৌশল বলেই ইঙ্গিত দিয়েছে।

তাছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্প তথাকথিত “ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি” নামের যে একপেশে শান্তি চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে, তার একজন কট্টর সমর্থক সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। এই কথিত শান্তি চুক্তির অর্থনৈতিক দিক উত্থাপন করার সময় বাহরাইন কনফারেন্সে মোহাম্মদ বিন সালমান নিজেই অংশ গ্রহণ করে, অনেক আরব দেশকে অংশগ্রহণে চাপ প্রয়োগ করে। অথচ, দু-পক্ষের শান্তি চুক্তি বলা হলেও এই ইস্যুতে ফিলিস্তিনিদের সাথে আলোচনা পর্যন্ত করা হয়নি। তাই পুরোপুরি একপাক্ষিক ইজরাইলি স্বার্থ রক্ষাকারী এই তথাকথিত শান্তি চুক্তিতে অন্ধ সমর্থন দিয়ে এমবিএস নিজেকে আরো বড় ইহুদিবাদী হিসবে পরিচয় দিয়েছে।

Friends of zion Museum এর প্রতিষ্ঠাতা ও মার্কিন ইভানজ্যালিকাল খৃষ্টান মাইক ইভান্স অনেকগুলো উপসাগরীয় আরব দেশ সফর করে, জানিয়েছিলেন, ওসব আরব দেশের নেতারা বহু ইহুদিদের চাইতেও বেশি ইজরাইলপন্থী। তার এই কথায় বিশেষভাবে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ও আবুধাবির তার কাউন্টারপার্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদকে ইঙ্গিত করা হয়েছিলো। তাই ফিলিস্তিনি জনগণের উপর ইহুদিবাদী ইজরাইলের লাগামহীন সম্প্রসারণবাদী গণহত্যার সব ইহুদিবাদী ভার্সনকে সমর্থন জানিয়ে এমবিএস আরব বিশ্বের সবচাইতে বড় ইহুদিবাদী নেতার পরিচয় দিয়েছে। তাই ভবিষ্যতে জেরুজালেমে সৌদি আরবের ইজরাইলি দূতাবাস খোলা হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছুই থাকবে না।