সহকর্মী আউয়াল ভাই ওপারে ভালো থাকবেন-ব্যারিস্টার সায়েম

245

 

সফল গণঅভ্যুত্থান ও এরশাদপতনের মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে নয় বছরব্যাপী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে। সে বছরেই আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম উচ্চ মাধ্যমিকে। সম্ভবত জুলাই-আগস্টের দিকে ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়, কিন্তু আন্দোলনের ঘনঘটায় ক্লাশ শুরু হতে হতে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ গড়িয়ে যায়। হোস্টেলেও উঠতে হয় তার পরে। তবে মাঝের সময়টুকুতে আমরা কখনোসখনো কলেজে যেতাম টুকিটাকি প্রশাসনিক কাজ সারতে কিংবা নেহায়েতই কৌতুহলের বশে। মফস্বল থেকে হঠাৎ ঢাকায় পাড়ি জমানো, আবার দেশসেরা কলেজে ভর্তি হতে পারার গর্ব আরো অনেক বন্ধুর মতো আমার ভেতর থেকেও জরুরি অবস্থা, কার্ফিউ এসবের ভয় উবে দিয়েছিলো। ঢাকায় এসে প্রথম উঠেছিলাম ছোট খালার বাসায়, বাসাবোতে। সেখান থেকে ট্যাম্পুতে চড়ে গুলিস্তান; তারপর গোলাপশাহ মাজার ও জাতীয় গ্রন্থাগারের পাশ ঘেঁষে পায়দল ওসমানী উদ্যান, শিক্ষা ভবন, দোয়েল চত্বর, বাংলা অ্যাকাডেমী, নীলক্ষেত, নিউমার্কেট হয়ে ঢাকা কলেজে পৌঁছুতে পারার আনন্দ ও উত্তজনা যে কী তীব্র ছিলো, তা বর্ণনার অতীত।

অগ্নিস্ফূরিত সে দিনগুলোতে যখনই কলেজ ক্যাম্পাসে যেতাম, দেখতে পেতাম ছাত্রদলের ছেলেরা মিছিল বের করেছে। বলে রাখা প্রাসঙ্গিক, ১৯৯০-৯১ ছাত্রসংসদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বার্ষিকী সম্পাদকের পদ ছাড়া পূর্ণ প্যানেলে জয় লাভ করে। ফলে কলেজ চত্বরে তাদের ছিলো দোর্দন্ড প্রতাপ, যদিও তা অর্জন করতে হয় ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক শোডাউন দিয়ে। যা-ই হোক, নতুন কয়েকজন বন্ধুসহ আমি সুযোগ পেলেই ছাত্রদলের মিছিল-সমাবেশে ঢুকে পড়তাম। মিছিলগুলোর অগ্রভাগে যারা থাকতেন তাদের তিনজনের নাম জানতে পেরেছিলাম তখন- সদ্য নির্বাচিত ভিপি মীর শরাফত আলী সফু, জিএস জাকির হোসেন এবং ছাত্রদল ঢাকা কলেজ শাখার সভাপতি জেড মূর্তজা তুলা। তবে যেচে চিনে নিয়েছিলাম আরও একজনকে, একেবারে গোড়ার দিকেই। কিন্তু সেটা সামনের সারিতে থাকার কারণে নয়, মিছিল শেষে তার বজ্রকণ্ঠি বক্তৃতার সুবাদে। তিনি আব্দুল আউয়াল খান। তখন তিনি কোন্ পদে ছিলেন বা ছাত্রসংসদে ছিলেন কিনা, আমার জানা নেই। কিন্তু মনে আছে, তার অগ্নিঝরা বক্তব্য ও প্রখর ব্যক্তিত্ব আমাদের সবার মন কেড়ে নিয়েছিলো। পরবর্তীকালে তাকে আমি পেয়েছিলাম একজন বড় ভাই, বন্ধু ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে। ঢাকা কলেজের পুরোটা সময় আমরা একসাথে ছাত্রদলের রাজনীতি করেছি।

১৯৯২ সালের গোড়ার কথা। আউয়াল ভাই আমাদের সময়ে ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন। যদিও বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে তারই ভিপি প্রার্থী হওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু রাজনীতির নতুন সমীকরণে তাকে নেওয়াজ ভাইয়ের প্যানেলে জিএস পদ মেনে নিতে হয়। সে নির্বাচনে এজিএস পদে আমার প্রার্থীতা প্রায় চূড়ান্ত ছিলো। সিনিয়র নেতাদের সবাই চেয়েছিলেন আমাকে, তবে আন্তরিকতার চূড়ান্ত দেখিয়েছিলেন যে চারজন মানুষ তাদের একজন প্রিয় আউয়াল ভাই। প্রসঙ্গের সম্পূর্ণতার জন্যে অন্যদের নামগুলোও না লিখলে নয়। তারা ছিলেন তৎকালীন ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি জনাব আবুল খায়ের ভুঁইয়া এবং ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস জাকির ভাই ও এজিএস সোহাগ ভাই। পরিতাপের বিষয়, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কারণে আমি শেষ মুহূর্তে প্রার্থী হতে অপারগতা প্রকাশ করি। বাকিদের মতো আউয়াল ভাইও খুব কষ্ট পেয়েছিলেন তখন। উল্লেখ্য, সেবার সবকটি পদে জয় লাভ করলেও এজিএস ও নাট্য সম্পাদক পদে পরাজিত হতে হয় ছাত্রদলকে। এজিএস পদটি হারানোর জন্যে আউয়াল ভাই বহুদিন পর্যন্ত আমাকে দূষেছিলেন। খায়ের ভাইও এখন পর্যন্ত সে যন্ত্রণা ভুলতে পারেননি।

ঢাকা কলেজ ছাড়ার পরে আউয়াল ভাইয়ের সাথে খুব একটা আর দেখা হয়নি। কথাও হয়েছিলো বেশ অনেকদিন আগে। সর্বশেষ কেন্দ্রিয় বিএনপিতে সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পেয়েছিলেন জেনে খুশি হয়েছিলাম, যদিও তিনি পূর্ণ সম্পাদক হওয়ার যোগ্যতা রাখতেন। কয়েকদিন আগে আউয়াল ভাইদের পারিবারিক বন্ধু লন্ডনপ্রবাসী বকুল আপা জানালেন, ভাই খুব অসুস্থ। কিন্তু বুঝতে পারিনি, অবস্থা এতটা খারাপ। বিজলী আপার সাথে কথা বলে খোঁজ নেবো ভেবেছি, কাজের চাপে তাও হয়নি। আউয়াল ভাইকে আজ খুব মনে পড়ছে। আমাদের না জানিয়ে হঠাৎ চলে গেলেন ঢাকা কলেজের বড় ভাই, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী জনাব আব্দুল আউয়াল খান। তরতাজা, প্রাণবন্ত – কখন কীভাবে – বন্ধুবৎসল, সদালাপি মানুষটির শরীরে রোগ ঢুকে পড়েছিলো, আমি খবরই পাইনি! আজ সকালে কেন্দ্রিয় যুবদল নেতা জিএস বাবুলের ফেইসবুক ওয়ালে চোখ স্থির হয়ে গেলো, আউয়াল ভাই মারা গেছেন! ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আল্লাহ আউয়াল ভাইয়ের সকল গুনাহ ক্ষমা করুন এবং তাকে জান্নাতের সর্বেচ্চ স্থানে ঠাঁই দিন। ওপারে ভালো থাকবেন, আউয়াল ভাই। আমি তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতিও সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। আমিন।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশনায়ক জনাব তারেক রহমানের সুযোগ্য উপদেষ্টা, বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার আবু সায়েমের ফেসবুক থেকে নেয়া।