জিয়া- একজন এথিক্যাল পলিটিশিয়ান -ব্যারিস্টার আবু সায়েম

375

ভাবুনতো, দেশটা স্বাধীন হয়ে গেল মাত্র নয় মাসে! কোন্ জাদুর বলে? একটি সুপ্রশিক্ষিত ও চৌকস সেনাদলের বিরুদ্ধে লড়াই করে এত স্বল্প সময়ে মুক্তি অর্জনের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। স্লোভেনিয়ার দশ দিনে যুদ্ধজয়ের গল্পটা ভিন্ন; তাদের ধারাবাহিক প্রস্তুতি ছিলো। ৭৮২৭ বর্গমাইলবেষ্টিত ভূখন্ডটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রাক-যুদ্ধকালে তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা কিংবা অদূরদর্শিতার পরিচয় দেয়নি। তাছাড়া ৯০’পরবর্তী যুগস্লাভ ইউনিয়নের ভেঙ্গে পড়ার আয়োজনটাও নিছক কল্পবিলাস ছিলো না। এতে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক শক্তিশমূহের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও সমর্থন ছিলো। যদিও বসনিয়া-হার্জেগোভিনার ক্ষেত্রে বোধগম্য কারণেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ন্যায়সঙ্গত ভূমিকা পালন করেনি, স্লোভেনিয়াসহ আর পাঁচটি দেশের ক্ষেত্রে সে ইস্যুও বিরাজমান ছিলো না।

 

বাংলাদেশ অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালী রাজনীতিকরা কোনরকম প্রস্তুতি ছাড়াই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন কিংবা জাতিকে যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান জন্ম নিলে বৃহত্তর বাংলাভূখন্ডের কর্তিত যে অংশটি পূর্ব বাংলা (১৯৫৫ সালে নাম বদলে হয় পূর্ব পাকিস্তান) নামে যাত্রা শুরু করে, কেন্দ্রের সাথে কখনোই তার সুসম্পর্ক ছিলো না। ভাষা নিয়ে শুরু হওয়া দ্বন্দ্ব শেষাবধি মুক্তির লড়াইয়ে রূপ নেয়। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র ছাত্র আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান এবং ৭০’র নির্বাচনী জাগরণের পথ ধরে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবটি ৭১’এ এসে আলোর মুখ দেখে। সময়টা দীর্ঘ সাড়ে তেইশ বছর। ঘটনাবহুল এ দুই যুগে স্বাধিকারের দাবিতে মাসকে মাস জেলখাটা রাজনীতিবিদদের স্বাধীনতাসংগ্রামের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি কেন ছিলো না, সেটি আজও এক অমীমাংসিত প্রশ্ন। এমনকি স্বাধীনতার কোন ঘোষণাপত্রও তৈরি ছিলো না। এমন পরিস্থিতিতে একটি কার্যকর ‘ডিক্ল্যারেশন অব্ ইনডিপেন্ডেন্স’ কিংবা ‘ওয়ার অব্ ইন্ডিপেনডেন্স’ ছিলো প্রায় অবাস্তবায়নযোগ্য এক বাস্তবতা। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অমার্জনীয় ব্যর্থতার এহেন পাদপ্রদীপেই মেজর জিয়ার আত্মপ্রকাশ।

বিতর্ক নেই, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সার্বিকভাবে জনযুদ্ধ হলেও রণাঙ্গনের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ছিলো সামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে। আমাদের সব অর্জন মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের কোর্টে ঠেলে দেওয়ার অসুস্থ প্রবণতা থেকে আওয়ামী লীগ আজকাল তাকেই মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বলে প্রচার করলেও, প্রকৃতপক্ষে তা ছিলেন কর্ণেল এমএজি ওসমানী। রণকৌশলে মুক্তিবাহিনীকে যে ৩টি ব্রিগেড ফোর্স ও বাংলাদেশকে যে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়, সবকটির প্রধানও ছিলেন সেনা কর্মকর্তারাই। যুদ্ধপরবর্তী রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্তির পরিসংখ্যান থেকেও বোঝা যায়, মুক্তিযুদ্ধে সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণ ছিলো সাহসী ও বিরোচিত। ২৫শে মার্চের ম্যাসাকারের পর স্বাধীনতার মূল ঘোষণাটাও আসে একজন সামরিক অফিসারের কন্ঠ থেকে। যদিও ২৫শে মার্চের মধ্যরাতে অন্য একটি ঘোষণার কথা প্রচার করা হয় কিছু মহল থেকে, তার ঐতিহাসিক সত্যতা যৌক্তিক কারণেই প্রশ্নবিদ্ধ। যদি আদতে সেটি হয়েও থাকে, তা ছিলো নিষ্ফল। পাশাপাশি এমনটাও দাবি করা হয়, স্বাধীনতার ঘোষণা নাকি ‘পড়া’ হয়েছে। যুক্তির বিচারে সেটিও ধোপে টিকে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ‘পঠিত’ হয়নি, ঘোষিত হয়েছিলো এবং ঘোষক ছিলেন জিয়াউর রহমান নামের এক ‘অখ্যাত’ মেজর। তিনি নিজের হাতে ঘোষণাটি লিখেছিলেন, অন্য কারো ঘোষণা পড়েননি। ৭১’এ যারা যুদ্ধ করেছেন, তারা জানেন কার ডাকে সেদিন ঘর ছেড়েছিলেন। আমি শহীদ-মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান; কিতাবের বাইরেও ময়দানের লড়াই সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানি। নয় মাসের সংগ্রামের সময়ে কার কী ভূমিকা ছিলে, ছোটবেলা থেকে সেসব শুনেই বড় হয়েছি।

 

সে যা-ই হোক, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের জয়লাভের পেছনে সেনাবাহিনীর কৃতিত্ব নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তারা জাতিকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন। তাদের দক্ষ হাতে গড়ে ওঠে একটি বিধ্বংসী সিভিলিয়ান-মিলিটারী যোদ্ধাদল, যাদের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পর্যুদস্ত হয়েছিলো হানাদারবাহিনী। মাত্র নয় মাসে দেশ স্বাধীন হওয়ার পেছনে সেটিই প্রধাণ কারণ বলে আমি মনে করি। অনেকে প্রতিবেশী দেশের সহযোগিতাকে বড় করে দেখাতে চান। অবশ্যই তারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলো; সেটা স্বাধীনতাকামী প্রায় প্রতিটি ভূখন্ডের মানুষের ভাগ্যেই জুটে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, যৌথবাহিনী মাঠে নামার আগে থেকেই পাকিস্তানীরা পিছু হটতে শুরু করেছিলো।

জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা থেকে আরম্ভ করে ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় লাভ করা পর্যন্ত সেনারা দক্ষতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছিলো বলেই বাংলাদেশের বিজয় তরান্বিত হয়। আমি নিশ্চিত, মেজর জিয়ার ঘোষণাই ৭ কোটি মানুষকে একযোগে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। পলায়নপর জাতি ঘুরে দাঁড়ায় তার মন্ত্রে। জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা ছাড়া মাত্র নয় মাসে বাংলাদেশ স্বাধীন হত এটা বিশ্বাস করা কঠিন।

 

মেজর জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা কি অনাকাঙ্ক্ষিত চমক ছিলো? সুযোগ পেলেন আর অমনি আওয়াজ দিয়ে দিলেন, I declare independence…? মোটেই না। ২৫শে মার্চ কালো রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লে সে খবর সর্বত্র পৌঁছে যেতে সময় লাগেনি। We revolt… উচ্চারণ করে তাৎক্ষণিক অমিত তেজ দেখিয়েছিলেন মেজর জিয়া। যিনি অস্ত্রবাহী জাহাজের জেনারেলের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলেন, তিনি মাঝপথেই বিদ্রোহ করে বসেন পাকিস্তানীদের হত্যাযজ্ঞের খবর পেয়ে। স্বাধীনতা ঘোষণার মনস্তত্ত্বটা সেখানেই জন্ম নেয়। তাৎক্ষণিক ব্যারাকে ফিরে মেজর জিয়া অনুগত কর্মকর্তা ও সৈন্যদের সংগঠিত করে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেন। পরবর্তীতে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের প্রভিশনাল প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেজর জিয়ার সহস্তলিখিত ঘোষণাটি ছিলো আনুষ্ঠানিকতামাত্র। প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার লে. জে. মীর শওকত আলী ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরের ঘটনা নিজে বর্ণনা করেছিলেন। জিয়া কীভাবে স্বাধীনতার রূপকার হয়ে ওঠেন তা তার লেখা খুঁজলে এখনো পাওয়া যাবে এবং জানা যাবে, সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলা জিয়ার বলিষ্ঠ বক্তব্যই কিছুটা সংশোধিত হয়ে পরে ইথারে ভেসে আসে। জিয়ার মতো দু:সাহসী মানুষের পক্ষেই কেবল সম্ভব ছিলো এমন ঝুঁকি নেওয়া। চাইলে তিনি চুপচাপ বসে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি রিভোল্ট করেছিলেন। কাজটি তিনি করতে পেরেছিলেন, কারণ তার মধ্যে এথিক্স ছিলো। সততা ও দেশপ্রেমসহ মানবীয় অসংখ্য গুণাবলীর সমাহার ছিলো ব্যক্তি জিয়ার চরিত্রে। তিনি ছিলেন একজন এথিক্যাল মানুষ। নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই মেজর জিয়া মুহূর্তের সিদ্ধান্তে পাকিস্তানীদের পক্ষ ত্যাগ করেন; স্বাধীনতার ঘোষণাও তারই সহজ ধারাবাহিকতা। কালের ব্যবধানে স্বাধীন বাংলাদেশে সৈনিক জিয়ার রূপান্তর ঘটেছিলো একজন এথিক্যাল পলিটিশিয়ানে।

 

আমি আজ জিয়াউর রহমানের সেই এথিক্যাল পলিটিক্স নিয়ে কথা বলবো। তার আর্থ-সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচী কিংবা আরও ব্যাপক অর্থে রাষ্ট্র বিনির্মাণের গল্প কেবল আলোচনার বিষয় নয়, গবেষণারও উপাদান। মাত্র পাঁচ বছরেরও কম সময়ে একটি দেশের জন্যে তিনি যা করেছেন, যখন তার নিজের বয়েসই ছিলো কেবল ৪০-৪৫, পৃথিবীর ইতিহাসে তা বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে গ্রন্থিত থাকবে। বিশ্ববাসীও শান্তির দূত প্রেসিডেন্ট জিয়ার কাছে নানাভাবে ঋনী। লজ্জা লাগে, আর সব বাদই দিলাম, তার খালখনন কর্মসূচীর ওপর থিসিস লিখে যারা ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেছে তারাও এখন দেখি প্রেসিডেন্ট জিয়ার সমালোচনা করে। এমন অকৃতজ্ঞ জাতির কপালে কী লেখা আছে ভাবতেও ভয় লাগে। কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে তোলার মানসে জিয়াউর রহমান যেসব কর্মসূচী প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেছিলেন সেসব আমাদের সবারই কমবেশি জানা। সে নিয়ে আর কথা বাড়াবো না। ফিরে যাচ্ছি জিয়ার এথিক্যাল পলিটিক্সে।

 

প্রয়াত সাংবাদিক চৌধুরী মোহাম্মদ ফারুকের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসার সুযোগ ঘটেছিল আমার রাজনৈতিক ও পেশাগত উভয় কারণে। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে প্রাণ রক্ষার্থে প্রথিতযশা এ সাংবাদিক বিলেতে পাড়ি জমান। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের একদার জাঁদরেল সভাপতি এবং দৈনিক মিল্লাত পত্রিকার সাবেক সম্পাদক, সবার প্রিয় ফারুক ভাই, বোধগম্য কারণেই আন্তর্জাতিক সুরক্ষা লাভ করে বসবাসের অনুমতি পান যুক্তরাজ্যে। খুব কাছে থেকে দেখার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, চৌধুরী মোহাম্মদ ফারুক ছিলেন জ্ঞান ও তথ্যের চলন্তিকা। সাংবাদিক হিসেবে তিনি যেমন ভ্রমণ করেছিলেন পৃথিবীর অসংখ্য দেশ, তেমনি অর্জন করেছিলেন বিচিত্রসব অভিজ্ঞতা। জানাশোনা জগতের এমন কোন দিক নেই যেখানে চৌধুরী সাহেবের সহজাত বিচরণ ছিল না কিংবা আমরা তার কাছ থেকে তথ্য-উপাত্তের জন্য ধরনা দেইনি। বিশেষত রাজনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সাংবাদিকতা, আইন ও সমাজবিজ্ঞানে ফারুক ভাই ছিলেন একজন ঝানু বোদ্ধা। কিন্তু এত যার জ্ঞানের পরিধি, ব্যক্তিগত জীবনে সে মানুষটি ছিলেন অসম্ভব বিনয়ী, মিতভাষী ও অজাতশত্রু।

 

রাজনীতির সূত্র ধরেই ফারুক ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম আলাপচারিতা। ধীরে ধীরে সেটি রূপান্তরিত হয় হৃদ্যতাপূর্ণ ব্যক্তিগত সম্পর্কে। বিশ্বাসের জায়গাটা অচ্ছেদ্য হয়ে উঠলে পরিবারের আইনি বিষয়গুলোতেও ফারুক ভাই আমার ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেন। ফলে আমি তার আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠি এবং ধারণা পেতে শুরু করি তার সাংবাদিকতার জীবন সম্পর্কে। জানতে পারলাম, প্রেসিডেন্ট জিয়ার খুব কাছে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো তার। প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী হিসেবে অনেক দেশও ভ্রমণ করেছিলেন ফারুক ভাই। জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আপনার দেখাতে কেমন মানুষ ছিলেন জিয়াউর রহমান?” সংক্ষেপে উত্তর দিয়েছিলেন, “নীতিবান, উদার ও পরিচ্ছন্ন।” কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে জেনে নিই আরও অনেক তথ্য। জিয়া কাজ ফেলে রাখতেন না এবং অগোছালো কাজ পছন্দ করতেন না। তিনি ছিলেন সংকীর্ণতার উর্ধ্বে। প্রেসিডেন্ট জিয়া সবাইকে নিয়ে রাজনীতি করা ও দেশ গঠনের পক্ষে ছিলেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র অবমুক্ত করা, সকল দলকে পুনরায় রাজনীতির লাইসেন্স দেওয়া, দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করা এবং সংবাদপত্র ও বিচারবিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছিলো তার সে দর্শনেরই বাস্তবায়ন। ফারুক ভাই বলেছিলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার বিষয়টি নিয়ে পারিষদদের অনেকেই তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে। তাদের বক্তব্যের সপক্ষে অনেক অকাট্য যুক্তিও ছিলো। জিয়া অগ্রাহ্য করলেন। তিনি তাদেরকে সংকীর্ণতা পরিহারের উপদেশ দিয়ে মন বড় করতে বললেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া ছিলেন ইনক্লুসিভ রাজনীতির কারিগর। তার কনসেপ্ট ছিলো, সংকীর্ণ ও হিংসাত্মক রাজনীতি কখনো রাষ্ট্রের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে একসাথে পথচলার বিকল্প নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিয়ার আগমনের প্রতিবাদে ছাত্ররা বিক্ষোভ করছিলো। প্রেসিডেন্ট কঠোর না হয়ে গাড়ি থেকে নেমে নিজেই ছাত্রদের দিকে এগিয়ে যান, তাদের বক্তব্য শুনতে চান। ফারুক ভাই এ প্রসঙ্গে জানালেন, জিয়া সবার সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চাইতেন। একজন সেনাকর্মকর্তা হয়েও তিনি কর্তৃত্ববাদী ছিলেন না। আওয়ামী লীগ সরকারের জারি করা জরুরি অবস্থা ও সামরিক শাসন প্রেসিডেন্ট জিয়া যে দ্রুততার সাথে তুলে নিয়েছিলেন, তা সময়ের প্রেক্ষাপটে অকল্পনীয় এক দৃষ্টান্ত। সাংবাদিক চৌধুরী মোহাম্মদ ফারুক প্রেসিডেন্ট জিয়ার এথিক্যাল স্ট্যান্ডার্ডের গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলেন।

 

আমি জ্ঞানমতে, একজন এথিক্যাল পলিটিশিয়ানের সকল গুণই জিয়ার ভেতরে ছিলো। আত্মীয়পরিজনদের তিনি কখনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ দেননি। বাংলাদেশের মানুষ জানতোই না, আজও জানে না, জিয়াউর রহমানের আত্মীয় কারা। প্রেসিডেন্টের ছেলে বলে তার সন্তানরাও স্কুলে কিংবা অন্যত্র অনৈতিক কোন সুবিধা ভোগ করেনি। প্রবল আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন এ মানুষটি পরিবার নিয়ে আটপৌরে জীবন যাপন করতেন। কেবল ব্যক্তিজীবনেই সৎ ছিলেন না জিয়া, তার ক্যাবিনেটের দিকেও দুর্নীতির আঙ্গুল তুলতে পারেনি কেউ কখনো। বিভিন্ন মতপথের মানুষদের এক প্ল্যাটফর্মে জড়ো করে তাদের সর্বোচ্চ ‘ভালো’টুকু তিনি আদায় করেছিলেন দেশের স্বার্থে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার এথিক্সে প্রভাবিত হয়ে তার পর্ষদও দুর্নীতিমুক্ত থেকে নিজেদের মেধা কাজে লাগাতে সচেষ্ট ছিলেন। জিয়াউর রহমানের সততার কঠিন ছাঁচে দুর্নীতিমনা পলিটিশিয়ানদের Politics বাস্তবিক অর্থেই Difficult হয়ে গিয়েছিলো।

 

ছেঁড়া গেন্জি ও ভাঙা স্যুটকেস রেখে যাওয়া আত্মপ্রত্যয়ী জিয়া চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদেরকে শিখিয়ে গিয়েছিলেন এথিক্যাল পলিটিক্স কী। ভাঙ্গা স্যুটকেস কোন জাদুর বাক্স নয়, একজন এথিক্যাল পলিটিশিয়ানের জীবনছবি। জিয়াউর রহমানের সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি শুধু পলিটিশিয়ান হিসেবেই নয়, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেও তাকে অনন্যসাধারণ উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলো।

 

জিয়াতো শিখিয়েছিলেন, কিন্তু আমরা কি মনে রেখেছি? বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ, বিভাজন ও বিয়োজনের যে বিষবাষ্প উড়ছে আজ, তার প্রধান কারণ প্রেসিডেন্ট জিয়াপ্রদর্শিত উদার ও সংকীর্ণতামুক্ত রাজনীতির লালন-পালন-অনুসরণ করতে পারিনি আমরা। তার দয়া ও ন্যায়পরায়ণতা যাদেরকে রাজনীতির স্পেইস তৈরি করে দিয়েছিলো, তারা আজ তাকে, তার পরিবারকে ও তার দলকে মুছে ফেলতে চায়। এমন নষ্ট, জীঘাংসামূলক ও কৃতঘ্ন রাজনীতির ঢামাডোলে দেশের স্বাধীনতা ও অস্তিত্বই বিপন্নপ্রায়। জিয়াউর রহমানের মতো একজন এথিক্যাল পলিটিশিয়ানের অভাব জাতি আজ পলে পলে অনুভব করছে।

 

শহীদ জিয়ার অবর্তমানে তার রেখে যাওয়া এথিক্যাল রাজনীতির দর্শনই পারে বাংলাদেশকে উদ্ধার করতে।

 

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার আবু সায়েমের ফেসবুক থেকে নেয়া।